কবিতা

কুমার অরবিন্দের একগুচ্ছ কবিতা ...

কাব্যকলি
  • ১০-১২-২০২৫

কুমার অরবিন্দের একগুচ্ছ কবিতা ...

কুমার অরবিন্দ একজন সমসাময়িক কথাসাহিত্যিক ও টেলিভিশন নাট্যকার । তাঁর পৈত্রিক নিবাস ফরিদপুর জেলার ডুমাইন গ্রামে, জন্ম রাজবাড়ি জেলার সাধুখালী গ্রামে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে, মাতুলালয়ে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আটটি। চারটি গল্পগ্রন্থ, তিনটি উপন্যাস ও একটি শিশুতোষ গ্রন্থ। এছাড়াও নয়টি নাটক (একক ও ধারাবাহিক) দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। আগামী ২০২৬ বইমেলায় প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ- দেয়ালে গাঁথা পিঠ ও বৈজ্ঞানিক কল্প-উপন্যাস – আলোকজন্ম।


আকাঙ্ক্ষিত

পড়ন্ত বিকেল মুমূর্ষু রোগির মতো চেতনাহীন-
বিরামহীন বিমর্ষে কাতর,
পাখিরা ফেরেনি,  বিবশ ডানায় তাদের ক্লান্তির ভার।
ক্ষয়িষ্ণু বিকেল স্থবির নতজানু,
দিবসের যাবতীয় ক্ষত শ্রান্তির প্রতীক্ষায়।

আমিও বিকেল পড়ে আছি উঠোনে তোমার
শত জনমের অপরাহ্ণ বুকে
আলোভূক অন্ধকারে তবুও প্রত্যাশায়
নিঃশেষিত হৃদয়, কাতর ব্যর্থ মন-ভূমি
নিশীথের বুক চিড়ে উদ্ভাসিতা হও কোনো এক তুমি।


জল নয় অনল শুধু 

একমুঠো জল নিয়ে কাছে এসে
কী গভির ব্যঞ্জনায় রইলে তাকিয়ে- প্রেমময়
আহা! অমন চোখে কেউ দেখেনি
অতীত বিস্মৃত হলো কুহেলিকায়।
মরুময় জীবন আশ্বাস পেলো, মুঠোভরা জলে ফলবে সবুজ
যাবতীয় দগ্ধতা শীতলতার কোলে মাথা গুঁজে হবে ইতিহাস
হায়! মুঠো খুলে দেখি; জল নয় আকাঙ্ক্ষার অনল শুধু  
দলিত মুকুল, আরাধ্য পুষ্পের হাসি 
উচ্চাশার বিষবাস্পে ঝলসে দিলে- যতসব প্রিয় কথামালা
যতসব ভালোবাসাবাসি।

অলক্ষ্যের শীর্ষে ঠিক যেতে হবে অতঃপর
রক্তের বিনিময়ে কেনা হবে ঘাম।
অতিক্ষুদ্র পাথরকণা, অন্তরে দৃঢ়তা অমিত
নিজেকে ভেঙেছি, ধ্বংসের বুকেই গড়ার প্রয়াস 
জীবনকে ফেলেছি অন্যের সাঁচে।
সেই মরুজীবনে এখন অবিরত ঢেউ ভাঙার মুখরতা শুনি
সবুজ-সোনালী ফসল চারদিক, আফসোস নেই আর কোনো
তবু মনে হয় কোনো একদিন তুমিও ছিলে
জলের বদলে যে অনল দিলে।


ভেসে যেতে আসিনি 

আমি ভেসে যাব না, ভেসে যেতে আসিনি
ভাঙা হাত-পায় স্রোতের বিরুদ্ধে কীভাবে চলতে হয়  
ডুবতে ডুবতে কেমনে পুরতে হয় ফুসফুসে অক্সিজেন
এসব আমার পূর্বপুরুষের কাছ থেকে শিখেছি। 
আমাকে শিখতে হয়েছে মৃত্যুর সম্মুখে দাঁড়িয়ে 
জীবনের গান কীভাবে গাইতে হয়। 

মাটির উদরে বাবাকে দেখেছি স্বপ্নের বীজ বুনতে
সে বীজ মৃত্তিকার গর্ভ ভেদ করে একদিন মেলে ধরে ডানা 
ক্রন্দনের পরিবর্তে ভরে তোলে হাসিতে হাসিতে দিগন্তরেখা 
উন্মুখ সবুজের সাথে ভাব হয় নীলিমার
শীর্ণকায় কৃষকের বুকের ক্যানভাসে আঁকা হয় 
আগামী দিন যাপনের সবুজ আল্পনা। 

তারপর একদিন ঝরে অথবা বন্যায়
অথবা প্রাণহীন খরায় 
ভেঙে যায় ভেসে যায় পুড়ে যায় স্বপ্ন 
বাবার সবুজ ক্যানভসে জমতে থাকে উপ্ত স্বপ্নের ফসিল  
না খেয়ে মরার দুশ্চিন্তা বাকি হাজারো চিন্তাকে খেয়ে ফেলে দ্রæত। 
তবু, স্থবিরতার কাছে নতজানু না হয়ে বাবাকে জীবনের ঘানি টানতে দেখেছি 
মরতে মরতে বেঁচে থাকার নেশায় বুঁদ হতে দেখেছি 
দেখেছি জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে পুরো জীবনটাই কাটিয়ে দিতে। 

আমি ভেসে যেতে আসিনি, ভেসে যাব না
স্রোতের বিমুখে চলতে শিখেছি- 
জীবনকে ঠিক পৌঁছে দেব জীবনের গন্তব্যে
দেখে নিয়ো... 


তবে কেমন হতো 

এমন যদি হতো- 
দুঃখগুলো ধরা যেত খাঁচার ভেতর
বিষণ্ণতা পাড়ি দিত অচিন দেশে
শৃঙ্খলে বন্দী হতো সব হতাশা 
কষ্টগুলো একই সাথে দেশ ছাড়ত শেষে
তবে কেমন হতো? 

মনের মানুষ থাকত যদি মনের কাছে 
মিছে ভাবনা বাঁধত বাসা বটের গাছে
মানুষ যদি মানুষ হয়েই থাকত সুখে 
থাকত হাসি অনিন্দিত সবার মুখে
তবে কেমন হতো? 

যদি-  তোমার আমার স্বপ্নগুলো একই হতো 
বেখেয়ালে ভাসত না নাও মাঝ দরিয়ায়
হিসাব কষেই বেহিসাবে চলত জীবন 
প্রীতির পদ্য থাকত লেখা চোখের তারায়
তবে কেমন হতো? 

পাগল

পাগলের প্রলাপে কি কাজ তোমার 
মাতালের বিলাপ বেশি ভালোবাস। 

শঙ্খচিলের ছায়ার পিছে দৌড়াতে দৌড়াতে 
পাগল বানিয়েছি চর্চিত খয়েরি চোখে 
তবু সে চোখ কাক্সিক্ষত চাওয়া চায় না’ক। 

পুবোন বাতাসে ফুটো নৌকায় পাল উড়িয়েছি 
মাতলামি ভালোবাস জেনেও পাগল হয়েছি। 

নীরবতা 

তবু নীরবতা থেকে থেকে কথা কয়ে ওঠে 
শব্দ-প্রতিবন্ধী প্রিয়তমার অ¯পষ্ট স্বরের মতো
চোখের ঝলকে, ঠোঁটের ফলকে- গুমরি গুমরি। 
অথচ পড়তে পারি তার সবটুকু বর্ণ পরিচয়
যেটুকু হয় না প্রকাশিত- থেকে যায় 
নিশীথের নিবিড় গুহায়- সেটুকুও। 

নীরবতাও হয়ে যায় মূক- মৌনতায় 
যার কণ্ঠ আছে, ভাষা আছে তার নীরবতায়। 

কবিতার জন্মরহস্য 
আর একটি কবিতা-মুহূর্ত ভিক্ষা চাই 
নতজানু হয়েছি ঝড়ে নুইয়ে পড়া দেবদারুর মতো
‘মাফ করেন’ বলে ফিরিয়ে দিয়ো না- 
পথচারী ভিখারি ভেবে 
গান্ধারীর মতো শতেক ভ্রূণ ধরতে পারো একটি ভ্রূণে। 

ঐশ্বর্যের ডালি তোমার হাতে 
চাইলেই পূর্ণ করে দিতে পারো আকাঙ্ক্ষার তের নদী
জানি কৃপণ নও- চরম মিতব্যয়ী 
তবুও তো হেমন্তের শূন্য মাঠে রাতভর শিশির ঝরাও 
চোখের কোনায় ক্ষণিক হেসে- 
ঝিনুক হৃদয়ে আমার মুক্তা ফলাও। 

চক্রব্যূহ  

চক্রব্যূহে প্রবেশ করে উদয়াস্ত যুদ্ধে ক্লান্ত অভিমন্যু 
অমোঘ নিয়তির সাথে ধেয়ে আসছে মৃত্যুবাণ
অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা তবু যুদ্ধের রসদ যোগায়। 

শুধু একবার চক্রব্যূহ ভেঙে 
কৃষ্ণচুড়ার লাজুক স্পন্দনে তোমাকে পেতে চাই
কোকিল ডাকা অবিন্যস্ত গোধূলির আভায়। 

ফিরব হাসিমুখে ব্যূহের হৃৎপিণ্ডে তারপর 
তখন অশ্বত্থমার শেলে ভাঙবে না হয় বুকের পাঁজর। 

বিনিময়

আমার ব্যক্তিগত জাতীয় দিবসে তোমাকে আমন্ত্রণ 
যদিও আমার ব্যক্তিগত বলে কিছুই নেই 
তোমার অস্তিত্ব প্রবহমান রক্তে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মতো। 

তবুও তুমি এসো শরীরি রূপ নিয়ে- খালি পায় 
নূপুরের শৃঙ্খলে কী কাজ বলো এক পা বেঁধে। 
নাইবা থাকল তোমার চুলে কাঁঠালচাঁপার ঘ্রাণ
খোলা চুল মেলে এসো বাতাসকে উসকে দিয়ে,
সাদামাঠা শাড়িই না হয় পরলে একদিন- 
চোখের পাতায় ভ্রূতে কাজ নেই কৃত্রিম রঙ মেখে। 
তোমার যে ঠোঁট ছুঁয়ে বের হয় নামটি আমার 
সে ঠোঁট ঢেকো না রঙের পালিশে।
একটু ছোঁয়ায় তোমার গালে আজো
কৃষ্ণচূড়া ফোটে।

আমি শুধু তোমাকে দেখতে চাই- মোড়কের তোমাকে নয়
আমার নিজস্ব দিনটিতে হোক না আরো কিছু গোপন ব্যথা বিনিময়।  

অবাঞ্ছিত 

শৈবালের মতো নির্বাক তাকিয়ে থাকি
সময়ের স্রোতে ভেসে এসেছি অনেকটা পথ
(কার কি-বা প্রয়োজনে জানা নাই।) 
যে পথ দিয়ে এসেছি সে পথে পশ্চাতে 
যায় না ফেরা, স্রোত সম্মুখগামী।  

আমার শৈবাল দেহে আজ পলির আস্তরণ 
মৃত বিবর্ণ প্রশাখা, বিবশ মাছের মৃত চোখ। 
জলের ঢেউ উতরে চলবার নাই শক্তি 
তবু ভেসে আছি ডুবছি না বলে।

 

শেয়ার করুন:
কাব্যকলি

শব্দের ক্যানভাসে আঁকি অনন্তের ছবি...